কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করে ব্যবসা শুরু করতে চান? একটি কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করা সঠিক সিদ্ধান্ত। এটি আপনাকে আইনি স্বীকৃতি দেয়, ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খোলা সহজ করে এবং গ্রাহক ও বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে সাহায্য করে।
সূচীপত্র
- প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি কি?
- ২. কোম্পানির আইন
- ৩. প্রাক পরিকল্পনা
- ৪. কোম্পানির কিছু টার্মস (শব্দ) ও অর্থ
- ৫. কি কি কাগজপত্র ও তথ্য লাগবে?
- ৬. খরচ (২০২৫ অনুযায়ী)
- ৭. সরকারি খরচ
- ৮. কনসালটেন্সি, ডকুমেন্টেশন ও প্রসেসিং ফি
- ৯. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে যা পাবেন
- ১০. রেজিস্ট্রেশনের পর করণীয়
- ধাপ ১: কোম্পানির ধরন নির্ধারণ করুন
- ধাপ ২: কোম্পানির নাম নির্বাচন করুন
- ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট প্রস্তুত করুন
- ধাপ ৪: RJSC-তে অনলাইনে আবেদন করুন
- ধাপ ৫: ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (TIN) ও ট্রেড লাইসেন্স নিন
- ধাপ ৬: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন
- ধাপ ৭: VAT রেজিস্ট্রেশন (যদি প্রযোজ্য)
- সতর্কতা ও পরামর্শ
- সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
- শেষ কথা
প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি কি?
প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হলো এমন একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান যেখানে শেয়ারহোল্ডারদের সংখ্যা সীমিত থাকে এবং এর শেয়ার বাইরের জনসাধারণের কাছে বিক্রি করা হয় না। এটি একটি আইনগত সত্তা, যার নিজস্ব অধিকার ও দায়িত্ব থাকে, এবং এর মালিকানায় কোন ব্যক্তিগত দায়বদ্ধতা থাকে না।
প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি হলো একটি পৃথক আইনি সত্তা, যেখানে:
- সদস্য সংখ্যা: সর্বনিম্ন ২ জন ও সর্বোচ্চ ৫০ জন শেয়ারহোল্ডার থাকতে পারে।
- দায়বদ্ধতা: শেয়ারহোল্ডারদের দায় শুধুমাত্র তাদের বিনিয়োগকৃত মূলধন পর্যন্ত।
- শেয়ার বিক্রয়: শেয়ার শুধুমাত্র প্রতিষ্ঠাতাদের মধ্যে হস্তান্তরযোগ্য, স্টক মার্কেটে বিক্রয় করা যায় না।
২. কোম্পানির আইন
বাংলাদেশে কোম্পানি গঠন সংক্রান্ত প্রধান আইন হলো ‘কোম্পানি আইন, ১৯৯৪’। এই আইনে কোম্পানির নিবন্ধন, পরিচালনা, অর্থনৈতিক কার্যক্রম, শেয়ার হোল্ডিং, অডিট, এবং অন্যান্য বিষয়াবলী সম্পর্কিত নিয়মাবলি নির্ধারণ করা হয়েছে।
বাংলাদেশে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি কোম্পানি আইন, ১৯৯৪ (Company Act, 1994) দ্বারা নিয়ন্ত্রিত হয়। এছাড়াও RJSC (Registrar of Joint Stock Companies and Firms) এর নিয়ম মেনে চলতে হয়।
৩. প্রাক পরিকল্পনা
কোম্পানি গঠন করার আগে আপনার ব্যবসার উদ্দেশ্য, প্রোডাক্ট বা সার্ভিস, লক্ষ্য বাজার, এবং টার্গেট অডিয়েন্স নির্ধারণ করা উচিত। এই পরিকল্পনা আপনাকে কোম্পানি গঠনের জন্য প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করবে।
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের আগে নিচের বিষয়গুলো ঠিক করুন:
- ব্যবসার ধরন (ট্রেডিং, ম্যানুফ্যাকচারিং, সার্ভিস ইত্যাদি)
- কোম্পানির নাম (ইউনিক ও অর্থপূর্ণ)
- মূলধন কাঠামো (শুরুর মূলধন কত হবে?)
- শেয়ারহোল্ডার ও ডিরেক্টর (ন্যূনতম ২ জন)
- রেজিস্টার্ড অফিসের ঠিকানা (ব্যবসার আইনি ঠিকানা)
৪. কোম্পানির কিছু টার্মস (শব্দ) ও অর্থ
টার্ম | অর্থ |
---|---|
MoA (Memorandum of Association) | কোম্পানির সংবিধান, লক্ষ্য ও মূল নিয়ম |
AoA (Articles of Association) | কোম্পানির অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা নিয়ম |
Shareholder | শেয়ার মালিক, যিনি লাভের অংশ পান |
Director | কোম্পানি পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি |
Authorized Capital | কোম্পানির সর্বোচ্চ অনুমোদিত মূলধন |
Paid-up Capital | শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা পরিশোধিত মূলধন |
৫. কি কি কাগজপত্র ও তথ্য লাগবে?
- শেয়ারহোল্ডার ও ডিরেক্টরদের NID/পাসপোর্ট (বিদেশি হলে)
- পাসপোর্ট সাইজের ছবি (সব সদস্যের)
- রেজিস্টার্ড অফিসের দলিল/ভাড়া চুক্তি
- MoA ও AoA (নোটারি পাবলিক দ্বারা সত্যায়িত)
- TIN সার্টিফিকেট (যদি থাকে)
৬. খরচ (২০২৫ অনুযায়ী)
বিষয় | খরচ (৳) |
---|---|
নামের ছাড়পত্র ফি | ৬০০ |
রেজিস্ট্রেশন ফি | ১০,০০০ – ২০,০০০ |
নোটারি ফি | ২,০০০ – ৫,০০০ |
কনসালটেন্সি ফি | ৫,০০০ – ২০,০০০ |
ট্রেড লাইসেন্স | ২,০০০ – ১০,০০০ |
TIN রেজিস্ট্রেশন | ফ্রি |
৭. সরকারি খরচ
- RJSC রেজিস্ট্রেশন ফি: মূলধনের উপর নির্ভর করে (~৳১০,০০০ – ৳৫০,০০০)
- নামের জন্য ফি: ৳৬০০ (অনলাইনে জমা দিতে হয়)
- স্ট্যাম্প ফি: MoA ও AoA-তে লাগে (~৳২,০০০ – ৳৫,০০০)
৮. কনসালটেন্সি, ডকুমেন্টেশন ও প্রসেসিং ফি
- কনসালটেন্ট ফি: ৳৫,০০০ – ৳২০,০০০ (ডকুমেন্ট প্রস্তুত ও RJSC প্রসেসিং সহ)
- লিগ্যাল ফি: যদি আইনজীবী দ্বারা MoA/AoA তৈরি করান (~৳১০,০০০ – ৳৩০,০০০)
৯. রেজিস্ট্রেশন সম্পন্ন হলে যা পাবেন
- কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট (CRC)
- মেমোরেন্ডাম ও আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (MoA & AoA)
- শেয়ার সার্টিফিকেট (যদি ইস্যু করা হয়)
- TIN ও BIN সার্টিফিকেট (যদি আবেদন করা থাকে)
১০. রেজিস্ট্রেশনের পর করণীয়
- ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন (CRC ও TIN দিয়ে)।
- ট্রেড লাইসেন্স নিন (স্থানীয় কর্তৃপক্ষ থেকে)।
- VAT রেজিস্ট্রেশন করুন (যদি বার্ষিক টার্নওভার ৳৩০ লক্ষ হয়)।
বাংলাদেশে কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন করার সম্পূর্ণ প্রক্রিয়া নিচে দেওয়া হলো।
ধাপ ১: কোম্পানির ধরন নির্ধারণ করুন
প্রথমেই ঠিক করুন আপনি কী ধরনের কোম্পানি চালু করতে চান। বাংলাদেশে প্রধানত তিন ধরনের কোম্পানি রয়েছে:
- একমালিকানা ব্যবসা (Sole Proprietorship) – একজন মালিক দ্বারা পরিচালিত, রেজিস্ট্রেশন সহজ।
- পার্টনারশিপ ফার্ম (Partnership Firm) – দুই বা ততোধিক ব্যক্তির মধ্যে চুক্তিভিত্তিক ব্যবসা।
- প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানি (Private Limited Company) – শেয়ারহোল্ডারদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, পৃথক আইনি সত্তা।
- পাবলিক লিমিটেড কোম্পানি (Public Limited Company) – স্টক এক্সচেঞ্জে তালিকাভুক্ত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
ধাপ ২: কোম্পানির নাম নির্বাচন করুন
কোম্পানির নাম অবশ্যই ইউনিক এবং বাংলাদেশের RJSC (Registrar of Joint Stock Companies and Firms) এর নীতিমালা অনুসারে হতে হবে। নামে “প্রাইভেট লিমিটেড” বা “পাবলিক লিমিটেড” যোগ করতে হবে।
👉 নামের জন্য শর্তাবলী:
- ইতিমধ্যে রেজিস্টার্ড নাম নেওয়া যাবে না।
- অফেন্সিভ বা সরকারি প্রতিষ্ঠানের নামের সাথে মিল থাকা যাবে না।
- নামে ব্যবসার ধরন ফুটিয়ে তোলা ভালো।
নামের উপযুক্ততা যাচাই করতে: RJSC ওয়েবসাইট ভিজিট করুন।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট প্রস্তুত করুন
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনের জন্য নিম্নলিখিত কাগজপত্র প্রয়োজন:
একমালিকানা/পার্টনারশিপের জন্য:
- মালিক/পার্টনারদের জাতীয় পরিচয়পত্র (NID)
- ট্রেড লাইসেন্স (স্থানীয় কর্পোরেশন/পৌরসভা থেকে)
- ব্যাংক সলভেন্সি সার্টিফিকেট (যদি প্রয়োজন হয়)
- ব্যবসার ঠিকানা প্রমাণ (উটিলিটি বিল/রেন্টাল এগ্রিমেন্ট)
প্রাইভেট/পাবলিক লিমিটেড কোম্পানির জন্য:
- মেমোরেন্ডাম অব অ্যাসোসিয়েশন (MoA) – কোম্পানির লক্ষ্য, মূলধন, শেয়ারহোল্ডারদের বিবরণ।
- আর্টিকেলস অব অ্যাসোসিয়েশন (AoA) – কোম্পানির অভ্যন্তরীণ নিয়মাবলী।
- পরিচালক ও শেয়ারহোল্ডারদের তথ্য (NID, পাসপোর্ট সাইজ ছবি)
- রেজিস্টার্ড অফিসের ঠিকানা প্রমাণ
- নোটারি পাবলিক দ্বারা সত্যায়িত ফরম
ধাপ ৪: RJSC-তে অনলাইনে আবেদন করুন
- RJSC ওয়েবসাইট এ গিয়ে অ্যাকাউন্ট খুলুন।
- ফর্ম-১ (নামের জন্য আবেদন) পূরণ করুন এবং ফি জমা দিন (প্রায় ৳৬০০)।
- নাম অনুমোদিত হলে, MoA ও AoA জমা দিন।
- প্রয়োজনীয় ফি পরিশোধ করুন (প্রাইভেট লিমিটেডের জন্য ~৳১০,০০০-৳২০,০০০)।
- ডকুমেন্ট ভেরিফিকেশনের পর সার্টিফিকেট ইস্যু হবে।
ধাপ ৫: ট্যাক্স আইডেন্টিফিকেশন নম্বর (TIN) ও ট্রেড লাইসেন্স নিন
- TIN নিবন্ধন: NBR ওয়েবসাইট থেকে করুন।
- ট্রেড লাইসেন্স: স্থানীয় সিটি কর্পোরেশন বা পৌরসভা থেকে সংগ্রহ করুন।
ধাপ ৬: ব্যাংক অ্যাকাউন্ট খুলুন
কোম্পানির রেজিস্ট্রেশন সার্টিফিকেট, TIN ও ট্রেড লাইসেন্স দিয়ে ব্যাংকে ব্যবসায়িক অ্যাকাউন্ট খুলুন।
ধাপ ৭: VAT রেজিস্ট্রেশন (যদি প্রযোজ্য)
বার্ষিক টার্নওভার ৳৩০ লক্ষ হলে BIN (বিজনেস আইডেন্টিফিকেশন নম্বর) নিবন্ধন করতে হবে।
সতর্কতা ও পরামর্শ
- একজন লিগ্যাল কনসালট্যান্ট বা চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টের সহায়তা নিন।
- নাম নির্বাচনের সময় সতর্ক থাকুন, যাতে পরে পরিবর্তন করতে না হয়।
- সমস্ত ডকুমেন্ট সঠিকভাবে পূরণ করুন, ভুল হলে প্রক্রিয়া বিলম্বিত হবে।
সচরাচর জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)
- প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানির ন্যূনতম মূলধন কত?
উত্তর: বাংলাদেশে ন্যূনতম ৳১ লক্ষ মূলধন দিয়ে শুরু করা যায়। - কোম্পানি রেজিস্ট্রেশনে কত সময় লাগে?
উত্তর: ডকুমেন্ট সঠিক থাকলে ৭-১৫ কার্যদিবস। - বিদেশি নাগরিক কোম্পানি রেজিস্টার করতে পারবেন?
উত্তর: হ্যাঁ, তবে বাংলাদেশি স্থানীয় অংশীদার বা ডিরেক্টর প্রয়োজন হতে পারে।
শেষ কথা
কোম্পানি রেজিস্ট্রেশন একটি আইনি প্রক্রিয়া, যা সঠিকভাবে করলে ভবিষ্যতে ঝামেলা এড়ানো যায়। উপরের ধাপগুলো অনুসরণ করে সহজেই আপনার ব্যবসাকে আইনগত ভিত্তি দিতে পারেন।
আরও জানতে: RJSC অফিসিয়াল ওয়েবসাইট বা একজন ব্যবসা আইন বিশেষজ্ঞের সাথে যোগাযোগ করুন।
মন্তব্য লিখুন