বাঘ হাতি শিকারে শাস্তি সর্বোচ্চ ১২ বছরের জেল ও ১৫ লাখ টাকা জরিমানার বিধান করে নতুন বন্যপ্রাণী অধ্যাদেশ জারি করা হয়েছে।
ক্রমবর্ধমান জলবায়ু পরিবর্তন ও বাস্তুতন্ত্রের ভারসাম্য রক্ষায় দেশের জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে অন্তর্বর্তী সরকার। ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) অধ্যাদেশ, ২০২৬’ জারি করে বাঘ ও হাতির মতো বিরল ও ঐতিহ্যবাহী প্রাণী শিকারের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রাখা হয়েছে।
বাসস জানায়, আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের লেজিসলেটিভ ও সংসদ বিষয়ক বিভাগ থেকে অধ্যাদেশটি জারি করে বিজি প্রেসের ওয়েবসাইটে গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়েছে।
নতুন আইনের প্রস্তাবনায় বলা হয়েছে, যেহেতু বৃক্ষের অনিয়ন্ত্রিত কর্তন ও অপসারণ সংশ্লিষ্ট এলাকার সামগ্রিক পরিবেশ, জীববৈচিত্র্য এবং প্রতিষ্ঠিত বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য বিনষ্ট করিতে সক্ষম; রক্ষিত এলাকা ও গণপরিসরে বৃক্ষ সংরক্ষণ করা এবং প্রাচীন ও ঐতিহ্যবাহী বৃক্ষ, স্মারক বৃক্ষ, পবিত্র বৃক্ষসহ অন্যান্য বৃক্ষ কর্তন ও অপসারণ নিয়ন্ত্রণ করা প্রয়োজন; এবং বিপদাপন্ন বৃক্ষের ক্ষেত্রে সংরক্ষণমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ জরুরি; এবং বন ও বৃক্ষ সংরক্ষণে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালার অতিরিক্ত বিধান প্রয়োজন।
সূচীপত্র
- বাঘ ও হাতি শিকারে কঠোর শাস্তি
- অভয়ারণ্য ও রক্ষিত এলাকায় কড়া বিধিনিষেধ
- প্রাচীন ও পবিত্র বৃক্ষ সংরক্ষণে নতুন ধারা
- সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ
- 🏛️ বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট
- ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা
- বনভূমি শর্তসাপেক্ষে বিনিময়
- বাঘ–হাতি শিকারে শাস্তি: বন কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা
- অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান
বাঘ ও হাতি শিকারে কঠোর শাস্তি
নতুন অধ্যাদেশের ধারা ৪১ ও ৪৪ অনুযায়ী, তফসিল–১(ক) ভুক্ত বাঘ বা হাতি শিকারের অপরাধে—
- প্রথমবার অপরাধে:
👉 সর্বনিম্ন ২ বছর থেকে সর্বোচ্চ ৭ বছর কারাদণ্ড
👉 ১ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা জরিমানা - একই ব্যক্তি দ্বিতীয়বার অপরাধ করলে:
👉 সর্বোচ্চ ১২ বছরের কারাদণ্ড
👉 সর্বোচ্চ ১৫ লাখ টাকা জরিমানা
এছাড়া অনুমতি ছাড়া বাঘ বা হাতির ট্রফি, মাংস বা দেহাংশ দখলে রাখলেও সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে।
অভয়ারণ্য ও রক্ষিত এলাকায় কড়া বিধিনিষেধ
নতুন অধ্যাদেশে বলা হয়েছে—
- অভয়ারণ্য ও জাতীয় উদ্যান ঘোষণার আগে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর মতামত গ্রহণ বাধ্যতামূলক
- রক্ষিত এলাকার ২ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো ইটভাটা বা বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান স্থাপন নিষিদ্ধ
- অভয়ারণ্যের ভেতরে চাষাবাদ, খনিজ আহরণ, আগুন লাগানো ও বিদেশি আগ্রাসী উদ্ভিদ প্রবেশ সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ
তবে বননির্ভর জনগোষ্ঠীর প্রথাগত অধিকার ও জীবিকার বিষয়টি বিবেচনায় রেখে ক্ষতিপূরণের বিশেষ বিধান রাখা হয়েছে।
প্রাচীন ও পবিত্র বৃক্ষ সংরক্ষণে নতুন ধারা
অধ্যাদেশে বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ—
- প্রাচীন বৃক্ষ
- ঐতিহ্যবাহী স্মারক বৃক্ষ
- পবিত্র বৃক্ষ
- প্রথাগত ‘কুঞ্জবন’
সংরক্ষণের বৈপ্লবিক ধারা যুক্ত করা হয়েছে। জীবনরক্ষার প্রয়োজন ছাড়া এসব বৃক্ষ ধ্বংস করলে সর্বোচ্চ ৬ মাসের জেল বা ৫০ হাজার টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন নিষিদ্ধ
নতুন অধ্যাদেশ অনুযায়ী—
- সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বন্যপ্রাণী কেনাবেচার বিজ্ঞাপন
- বন্যপ্রাণীর প্রতি নিষ্ঠুরতার ভিডিও প্রকাশ
- লাইসেন্স ছাড়া বন্যপ্রাণী বা ট্রফি দখলে রাখা ও বেচাকেনা
সবই শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে।
🏛️ বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট
বন্যপ্রাণী উদ্ধার ও সংরক্ষণে সরকার গঠন করবে—
- বন্যপ্রাণী ট্রাস্ট ফান্ড
- বিমানবন্দর, স্থলবন্দর ও সমুদ্রবন্দরে সমন্বিত ‘বন্যপ্রাণী অপরাধ নিয়ন্ত্রণ ইউনিট’
এছাড়া আন্তর্জাতিক সাইটিস কর্তৃপক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালনের জন্য একটি বৈজ্ঞানিক কমিটি গঠনের কথাও বলা হয়েছে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর অধিকার সুরক্ষা
অধ্যাদেশে উল্লেখ করা হয়েছে, আইন প্রণয়নের আগে ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর প্রথাগতভাবে সংগৃহীত বন্যপ্রাণীর ট্রফি বা স্মৃতিচিহ্ন জব্দের আওতাভুক্ত হবে না।
বনভূমি শর্তসাপেক্ষে বিনিময়
অধ্যাদেশের ৮ ধরায় বলা হয়েছে-
(১) কোনো বিধিবদ্ধ সংস্থা বা শিল্প প্রতিষ্ঠানের মালিকানাধীন ভূমির অভ্যন্তরে বিচ্ছিন্নভাবে এক একরের নিম্নে কোনো বনভূমি থাকিলে অপরিহার্যতা ও জনস্বার্থ বিবেচনায় এই অধ্যাদেশের অধীন বিধি দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে সরকারের অনুমোদনক্রমে বিনিময়ের অনুমতি প্রদান করা যাইবে।
(২) উপ-ধারা (১) এ বর্ণিত ক্ষেত্রে সরকারি গেজেট প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে উক্ত বনভূমির পরিবর্তে সংশ্লিষ্ট বন সংলগ্ন বনায়ন উপযোগী দ্বিগুণ নিষ্কণ্টক ভূমি উক্ত সংস্থা বা শিল্প প্রতিষ্ঠান কর্তৃক বন বিভাগকে হস্তান্তর করিতে হইবে।
(৩) উপ-ধারা (২) অনুযায়ী হস্তান্তরিত ভূমি সরকার সংরক্ষিত বনভূমি হিসাবে ঘোষণা করিবে।
বাঘ–হাতি শিকারে শাস্তি: বন কর্মকর্তাদের বিশেষ ক্ষমতা
নতুন আইনে বন কর্মকর্তাদের ম্যাজিস্ট্রেটের আদেশ ছাড়াই গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। দ্রুত পচনশীল জব্দকৃত দ্রব্য তাৎক্ষণিক ধ্বংসের সুযোগও রাখা হয়েছে। দণ্ডাদেশের বিরুদ্ধে ৩০ দিনের মধ্যে আপিল করা যাবে।
অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ বিধান
- বন্যপ্রাণীর আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হলে সরকার ক্ষতিপূরণ দেবে
- সরকার প্রয়োজনে এয়ারগান আমদানি ও ব্যবহার নিষিদ্ধ করতে পারবে
- স্থানীয় জনগণের অংশগ্রহণে সহ-ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি চালু হবে
উল্লেখ্য, এই অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমে ২০১২ সালের ‘বন্যপ্রাণী (সংরক্ষণ ও নিরাপত্তা) আইন’ বাতিল করা হয়েছে।
মূল আইনের পিডিএফ নিচে দেয়া হলো:






মন্তব্য লিখুন